মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

কাজী আনোয়ার হোসেন

শিল্পী কাজী আনোয়ার হোসেন এর সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তামত্ম

 

শিল্পী’র নাম               : কাজী আনোয়ার হোসেন

পিতা’র নাম               : কাজী আবুল হোসেন (পুলিশ ইন্সপেক্টর)

মাতা’র নাম               : মোসাম্মৎ অহিদুন্নেছার

স্ত্রী’র নাম                  : মোসাম্মৎ সুফিয়া আনোয়ার

জন্ম তারিখ               : ০১/০১/১৯৪১ইং।

মৃত তারিখ                 : ০৮/০২/২০০৭ইং।

শিক্ষাগত যোগ্যাতা       : ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনষ্টিটিউটি থেকে স্নাতকত্তোর পাস।

জন্ম স্থান                  : গ্রামঃ কুরপালা, পোঃ পিনজুরী

                               থানাঃ কোটালীপাড়া, জেলাঃ গোপালগঞ্জ।

বর্তমান ঠিকানা           : কাজী বাড়ী, মিলন সিনেমা হল রোড, মাদারীপুর সদর, মাদারীপুর।

 

সমত্মানদের নাম          : মেয়ে   ১। কাজী ফারহানা হোসেন (চাঁদনী) (গৃহিনী)

                                         ২। কাজী সোহিনী আক্তার (উর্মী) (গৃহিনী)ক্ষি

                               ছেলে   ৩। কাজী আশিকুর হোসেন (অপু) (সাংবাদিক)

                                        ৪। কাজী মসিউর হোসেন (দিপু) (এ্যাডভোকেট)

 

 

 

নিভৃতচারী  চিত্রশিল্পী কাজী আনোয়ার হোসেন (নৌকা আনোয়ার)

মরণোত্তর একুশে পদকের জন্য মনোনীত

 

কাজী আনোয়ার হোসেন-যিনি নৌকার ছবি এঁকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে এসে তাঁর কাছ থেকে ‘নৌকা আনোয়ার’-এর খেতার পেয়েছিলেন। সেই প্রখ্যাত চিত্রশিল্পীর আজীবন কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ এবার তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক-২০১৬ প্রদান করা হলো। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বুধবার রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদকপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এ সংবাদ পাওয়ার পর মাদারীপুরবাসী আনন্দ-উল­াসে মেতে ওঠেন। আগামী ২০ ফেব্রম্নয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে একুশে পদক প্রদান করবেন। ঐ দিন মরহুম চিত্রশিল্পী কাজী আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী সুফিয়া আনোয়ার এই মরণোত্তর একুশে পদক গ্রহণ করবেন।

কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৪১ সালে গোপালগঞ্জ জেলার কুরপালা গ্রামের প্রখ্যাত কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কাজী আবুল হোসেন ছিলেন পুলিশ ইন্সপেক্টর ও মাতা অহিদুন্নেছা। ১৩ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। কাজী আনোয়ার হোসেন গোপালগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করলেও শৈশব থেকে পরিবারের সঙ্গে মাদারীপুর শহরেই বসবাস শুরম্ন করেন। এ শহর ও শহরতলীর বিচিত্র শ্যামলিমা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে তাঁর বেড়ে ওঠা। এ অঞ্চলের নৈসর্গিক দৃশ্যপট তাঁর হৃদয়কে আলোড়িত করে তোলে শিশু বয়সেই।

শৈশব থেকেই বিচিত্র ঢঙে, নানা রঙে, নানা বর্ণের নৌকার ছবি আঁকার মধ্যদিয়ে কাজী আনোয়ার হোসেন শিল্পী জগতে প্রবেশ করেন। মাধ্যমিক স্কুলের পরীক্ষার খাতায় নৌকার ছবি এঁকে সবাইকে অবাক করে দিয়েছিলেন নিভৃতচারী এই চিত্রশিল্পী। সেই থেকে মৃত্যুর আগ পর্যমত্ম রং তুলিতে বর্ণবিভা ছড়িয়ে গেছেন তিনি। নদীতে পানির ঢেউ, কাঠের নৌকা, প্রাকৃতিক দৃশ্য, নৈসর্গিক দৃশ্যপট চিত্রায়িত হয়েছে তাঁর নিপুঁণ হাতে। তাঁর আঁকা অসাধারণ সব ছবি দেখে বিমোহিত হয়েছেন অনেক চিত্রশিল্পীসহ বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ। প্রশংসা কুড়িয়েছেন দেশ-বিদেশের রাষ্ট্রনায়কদের।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত ইন্দ্রিরা গান্ধী যখন বাংলাদেশ সফরে আসেন তখন কাজী আনোয়ার হোসেনের হাতে আঁকা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ছবি ইন্দ্রিরা গান্ধীকে উপহার দেওয়া হয়। ছবিটি বর্তমানে ভারতের রাজধানী নয়া দিলিস্ন’র মডার্ন আর্ট গ্যালারিতে সংরক্ষিত আছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই গুণি শিল্পীকে আদর করে ‘নৌকা আনোয়ার’ বলে ডাকতেন। সেই থেকে তিনি নৌকা আনোয়ার নামে সকলের কাছে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর শিল্পী হয়ে ওঠার নেপথ্যে ছিলেন এক মহিয়ষী রমনী কাজী আনোয়ার হোসেনের মাতা অহিদুন্নেছা। যাঁর আমত্মরিক প্রচেষ্টা ও ঐকামিত্মক সহযোগিতা ছিল শিল্পীর পাথেয়।

শিক্ষা জীবনে ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারম্নকলা ইন্সটিটিউট থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর ছবি আঁকা আনোয়ার হোসেনের স্বল্প আয়ের অবলম্বন ও জীবন-জীবিকা হয়ে দাঁড়ায়। মন-পবনের নৌকার টানে বাংলার নদী নিসর্গ আর নৌকা ক্রমশ বিচিত্র বর্ণ ব্যঞ্জনায় রূপ পেতে থাকে তাঁর তুলি আর জলরঙ্গে। পরিণত বয়সে এসে তিনি মিনিয়েচার ছবির দিকে ঝুঁকে পড়েন। ছবির উপকরণের ক্ষেত্রে আধুনিক কালের চিত্রশিল্পীদের মতো অভিনব প্রবণতা লক্ষণীয়। বলা যায়, সে ধারায় শিল্পী আনোয়ার হোসেনের কাজেও বৈচিত্র যথেষ্টই। ক্যানভাস হিসেবে সহজ উপকরণ ব্যবহার করতে শুরম্ন করেন তিনি। দিয়াশলাইয়ের খাপের কাঠের অংশের উপর নৌকা এবং অনির্বাসভাবে নদীর দৃশ্যও চিত্রায়িত করেন। যা ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের কারণে আজও ব্যাপকভাবে সমাদৃত। এছাড়া ছবির উপকরণ হিসেবে আঠা, গাছের পাতা, ছাল, আমের বীজ, মাছের কাটা, হাড়, হরিণ ও মহিষের সিং, পেঁপে গাছ, রাজহাঁসের ডিম, পথে কুড়িয়ে পাওয়া অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, টুকরা কাপড় ইত্যাদি ব্যবহার করতে থাকেন।

সীমিত রঙের ব্যবহার সম্বলিত তাঁর এ ধরণের শিল্পকর্মগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় রেঁনেসার অমর শিল্পী লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির কাজের মিল পাওয়া যায়। জীবন নৌকার যাত্রী হয়ে পাশ্চাত্যে পাড়ি জমানোর সুযোগও পেয়েছিলেন তিনি। ৮০’র দশকের শুরম্নতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের সাড়া জাগানো ‘‘দি ফাদার’’ ছবির মুখ্য ভূমিকায় অভিনয়কারী তৎকালীন ইউএনডিপি’র ঢাকাস্থ অফিসের এক কর্মকর্তা মার্কিন নাগরিক জন এডাম নেপিয়ার ঐ সিনেমায় কাজী আনোয়ার হোসেনের বেশ কিছু ছবি ব্যবহার করেন। তিনি আমেরিকায় ফেরার সময় শিল্পীর আঁকা বেশকিছু ছবি সঙ্গে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর ছবি বহু দর্শকের আগ্রহের সৃষ্টি করে। আহবান আসে আমেরিকায় যাওয়ার। কিন্তু শ্যামল বাংলার নৌকার রহস্য উম্মোচন তো তখনো অনেকটাই বাকি রয়ে গেছে শিল্পীর। তাই দেশে বসে ছবি অাঁকার জন্য আমেরিকায় যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগটিও অবলীলায় হাত ছাড়া করেন আত্মভোলা এই মানুষটি।

কাজী আনোয়ার হোসেনের আঁকা ছবিগুলো দেখে বোঝা যায়, তাঁর আঁকা চিত্রজগৎ যেন নৌকার এক নিরবচ্ছিন্ন মিছিল। কখনো ঘাটে বাঁধা নৌকার সারি, কখনো ভাসমান নৌকা, একটি অথবা একজোড়া অথবা অনেক মাছ ধরার জেলে নৌকা, পানসী নৌকা, খেয়া নৌকা, ছিপ নৌকা, বাইচের নৌকা প্রভৃতি বিচিত্র ধরণের অজস্র নৌকা নানা বর্ণচ্ছটায় মূর্ত হয়ে উঠেছে তাঁর ক্যানভাসে। নৌকার মাধ্যমে জীবনের গতিশীলতার যে রূপ তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তার পাশাপাশি সেই নৌকারই মাঝিমালস্না কিংবা চা দোকানীসহ আবহমান বাংলার গ্রামীণ জীবনযাত্রার দৃশ্য উঠে এসেছে তার চিত্রকর্মে। এর মধ্য দিয়েই ফুটে উঠেছে তার জীবন দর্শন, সহজ, সরল, সচলতা আর কর্মমূখরতার প্রশামত্ম বর্ণবৈভব।

১৯৮৮ সালের বন্যা এবং তার আনুসাঙ্গিক মানবিক বিপর্যয় শিল্পীকে প্রচন্ডভাবে আলোড়িত করে। বন্যার ছবির একক চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে বিক্রির ব্যবস্থা করেন তিনি। সেই ছবির বিক্রয়লব্ধ টাকা বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ এবং বন্যা পরবর্তী পূনর্বাসনে দূর্গত মানুষের সহায়তা করেছেন। শিল্পীর সহধর্মিনী মিসেস সুফিয়া আনোয়ার ও ছেলে কাজী আশিকুর হোসেন অপুর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৬৫ সাল থেকে শুরম্ন করে মৃত্যুর আগ পর্যমত্ম দেশে-বিদেশে ২২ টিরও বেশি একক ও যৌথ প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছে তাঁর আঁকা ছবি। রক্ষিত রয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর, জাতীয় চিত্রশালাসহ দেশের বহু আর্ট গ্যালারিতে। এছাড়া অসংখ্য ছবি রয়ে গেছে দেশ ও বিদেশের চিত্র পিপাসুদের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায়। কাজী আনোয়ার হোসেনর আঁকা ছবি অনেক বিশিষ্টজনেরা সংগ্রহ করে রেখেছেন। এর মধ্যে উলেস্নখযোগ্য ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রিরা গান্ধী, নেপালের রাজা, ফিলিস্থিনের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত, যুগোসেস্নাভিয়ার বিশ্ব নেতা মার্শাল টিটো, সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটন, সাবেক মার্কিন ফাস্ট লেডি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। এছাড়া বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও কুটনীতিক ও শিল্পানুরাগী ব্যক্তিবর্গের সংগ্রহশালায় রয়েছে শিল্পীর আঁকা ছবি। প্রয়াত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সমাদ আজাদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাঁর শিল্পকর্মগুলো বাইরে সফরে যাওয়ার সময় সঙ্গে নিয়ে যেতেন উপহার দেওয়ার জন্য। এই গুণী শিল্পী কাজী আনোয়ার হোসেন ২০০৭ সালের ৮ ফেব্রম্নয়ারি মাদারীপুর শহরের নিজ বাড়ির দোতলায় নৌকার একটি ছবি আঁকার সময় রংতুলি হাতে থাকা অবস্থায় ছবির উপর মাথা রেখেই মৃত্যুবরণ করেন। কথা হয় তাঁর বড় জামাতা মীর এনামুল ইসলামের সঙ্গে, তিনি জানালেন শিল্পী কাজী আনোয়ার হোসেনের আঁকা সহস্রাধিক ছবি এখনো অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।  তাঁর ইচ্ছা ছিল ছবিগুলো বিক্রি হলে বিক্রয়লব্ধ অর্থ আর্ত মানবতার সেবায় ব্যয় করার।

দীর্ঘদিন ধরে মাদারীপুর থেকে দাবী উঠে এই গুণী চিত্রশিল্পী কাজী আনোয়ার হোসেনকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করার। এ ব্যাপারে সোচ্চার হয়ে ওঠে মাদারীপুরের সুশীল সমাজ, সাংবাদিক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনসহ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ। এই গুণী শিল্পীকে মুল্যায়নের জন্য একুশে পদক-২০১৬ প্রদানে মাদারীপুর জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকেও মনোনয়নের আবেদন করা হয়। আজ তার সফল বাসত্মবায়ন অর্থ্যাৎ কাজী আনোয়ার হোসেন (‘‘নৌকা আনোয়ার’’)কে মরণোত্তর একুশে পদক-২০১৬ প্রদান করায় মাদারীপুরবাসী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

নৌপরিবহণমন্ত্রী শাজাহান খান এমপি বলেন, ‘‘চিত্রশিল্পী কাজী আনোয়ার হোসেন শুধু মাদারীপুর নয়-তিনি সারা বাংলার গর্ব। যিনি নিপুঁণ হাতে সারা জীবন নৌকার ছবি এঁকেছেন-তাঁকে মূল্যায়ণ করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। ইতোমধ্যে তাঁর নামে মাদারীপুর শহরে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। এই গুণী চিত্রশিল্পী কাজী আনোয়ার হোসেন অর্থ্যাৎ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান‘এর আদর করে দেওয়া নাম ‘‘নৌকা আনোয়ার’’কে মরণোত্তর একুশে পদক-২০১৬ দেওয়ায় শুধু মাদারীপুর নয়, সারা বাংলাদেশের মানুষ গর্বিত’’।

 

 

একজন নৌকা আনোয়ারের জীবন কাহিনী

 

এক অনিঃশেষ নৌযাত্রা শুরম্ন করেছিলেন শিল্পী কাজী আনোয়ার হোসেন, সেই সুদুর শৈশবে মাধ্যমিক স্কুলের পরীক্ষার খাতায় নৌকা এঁকে নিজের জীবনের নৌকা ভাসিয়ে ছিলেন চিত্র শিল্পের গহিন দরিয়ায়। এরপর থেকে রং তুলির মাধ্যমে বিচিত্র বর্ণ বিভা ছড়িয়ে পানির ঢেউ, কাঠের নৌকা আর তার জীবন একাকার হয়ে এগিয়ে চলেছে মহা সমুদ্রের পথে।

 

শিল্পী কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৪১ সালে গোপালগঞ্জ জেলার কুরপালা গ্রামের সম্ভ্রামত্ম কাজী বংশের কাজী আবুল হোসেন (পুলিশ ইন্সপেক্টর) ও অহিদুন্নেছার ঘরে জন্ম নেন। ১৩ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। শিল্পীর সকল ভাই বোন ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। শিল্পীর বিচক্ষণ পিতা মাতা তার প্রতিভার পথে কোনরকম প্রতিবন্ধকতা আসতে দেননি। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারম্নকলা ইনষ্টিটিউটি থেকে স্নাতক উত্তীর্ণের পর ছবিই আনোয়ার হোসেনের স্বপ্ন, অবলম্বন ও জীবিকা। শিল্পীর ঘনিষ্ট বন্ধু রফিকুন নবী (রনবী)’র সঙ্গে শিক্ষাজীবনসহ প্রায় ৪৫ বছর সময় কাটান। মন-পবনের নৌকার টানে বাংলার নদী নিসর্গ আর নৌকা ক্রমশ বিচিত্র বর্ণ ব্যঞ্জনায় রূপ পেতে থাকে তার বঙ্কিম তুলি আর জলরঙ্গে।

 

পরিনত বয়সে এসে তিনি মিনিয়েচার ছবির দিকে ঝূঁকে পড়েন। ছবির উপকরণের ক্ষেত্রে আধুনিক কালের চিত্রশিল্পীদের ন্যায় অভিনব প্রবণতা লক্ষনীয়। বলা যায়, সে ধারায় শিল্পী আনোয়ার হোসেনের কাজেও বৈচিত্র যথেষ্টই। ক্যানভাস হিসেবে সহজ উপরকণ ব্যবহার করতে শুরম্ন করেন তিনি। দিয়াশলাইয়ের খাপের কাঠের অংশের উপর নৌকা এবং অনিবার্ষভাবে নদীর দৃশ্যও চিত্রায়িত করেন যা ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের কারণে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। এ ছাড়া ছবির উপকরণ হিসেবে আঠা, গাছের পাতা, ছাল, মাছের কাটা, হাড়, টুকরা কাপড় ইত্যাদি ব্যবহার করতে থাকেন। সীমিত রঙ্গের ব্যবহার সম্বলিত তার এ ধরনের শিল্পকর্মগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় রেনেসার অমর শিল্পী নিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির কাজের মিল পাওয়া যায়।

 

জীবন নৌকার যাত্রী হয়ে পাশ্চাত্যে পাড়ি জমানোর সুযোগও অবশ্যে তিনি পেয়েছিলেন। আশির দশকের শুরম্নতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের সাড়া জাগানো ’’দি ফাদার’’ ছবির মুখ্য ভূমিকায় অভিনয়কারী তৎকালীন ইউ.এন.ডি.পি’র ঢাকাস্থ অফিসের এক কর্মকর্তা মার্কিন নাগরিক জন এডাম নেপিয়ার ঐ সিনেমায় কাজী আনোয়ার হোসেনের বেশ কিছু ছবি ব্যবহার করেন। আমেরিকায় ফেরার সময়ে শিল্পীর ছবিও সঙ্গে করে নিয়ে যান। সেখানে তার ছবি অনেকের আগ্রহের সৃষ্টি করে। আহববান আসে আমেরিকায় যাবার, কিন্তু শ্যামল জলজ বাংলার নৌকার রহস্য উম্মোচন তো তখনো অনেকটাই বাকি রয়ে গেছে শিল্পীর। কাজেই সাতসমূদ্র পাড়ি দেওয়া আর হয়ে উঠেনা।

 

কাজী আনোয়ার হোসেনের ছবির জগৎ যেন নৌকার এক নিরবচ্ছিন্ন মিছিল। কখনো ঘাটে বাঁধা নৌকার সারি, কখনো স্রো্তে ভাসমান নৌকা। একটি অথবা একজোড়া অথবা অনেক মাছ ধরার নৌকা পানসী, খেয়া নৌকা, ছিপ নৌকা প্রভৃতি বিচিত্র ধারার অজস্র নৌকা নানা বর্ণচ্ছটায় মূর্ত হয়ে উঠেছে তার ক্যানভাসে। নৌকার মাধ্যেমে জীবনের গতিশীলতার যে রূপ তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তার পাশাপাশি সেই নৌকারই মাঝিমালস্না, কিংবা চা দোকানীসহ সরল জীবনযাত্রার দৃশ্য উঠে এসেছে তার চিত্রমালায়। এর মধ্যে দিয়েই ফুটে উঠেছে তার জীবন দর্শন, সহজ, সরল, সচলতা আর কর্মমূখরতার মধ্যে প্রশামত্ম বর্ণবৈভব।

 

মূলত, মূর্ত ছবির ধারাকে অবলম্বন করলেও আধুনিক চিত্রকলার একজন সাধক হিসেবে তার ছবি সাবলীলভাবেই বিমূর্ত ধারাকেও আত্নস্থ করেছে, ঘটিয়েছে দুই ধারার মিশেল। তার মূর্ত-বিমূর্ত নানা অলঙ্করনের মধ্যে দিয়ে প্রতীকায়িত হয়েছে জীবনের বিচিত্র অনুষঙ্গ।

 

এই শিল্পীর কাজের অন্য একটি দিক, কবরস্থানে পাকা স্থাপনায় অলঙ্করন। নিজস্ব ঢংঙে বিশেষ ব্যঞ্জনায় কবর বেষ্টনিতে সৌন্দর্য্য সৃষ্টির যে শৈল্পিক ভূমিকা তিনি পালন করেছেন, তা তাকে দিয়েছে আধুনিক শিল্পীদের মধ্যে একত্রে অনন্য অবস্থান।

 

কিন্তু, শুধুই সৌন্দর্য্যে সৃষ্টি বা জীবন চিত্রন নয়, দূর্যোগের কালে মানবিকতার মহা আহববান শিল্পীকেও প্ররোচিত করে সময়োচিত কর্তব্য স্থির করতো। ১৯৮৮ সালের মহা বন্যা এবং তার আনুসাঙ্গিক মানবিক বিপর্যয় শিল্পীকে প্রচন্ডভাবে আলোড়িত করে। বন্যার ছবি একে একক চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে বিক্রির ব্যবস্থা করেন তিনি এবং সেই ছবি বিক্রির টাকা বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণসমগ্রী বিতরণ এবং বন্যা পরবর্তী পূনর্বাসনে দূর্গত মানুষদের সহায়তার জন্য বন্টনের মাধ্যমে শিল্পীর অঙ্গীকার ও মানবিক নৈতিক দায়িত্বের মেলবন্ধন ঘটান।

 

১৯৬৫ সাল থেকে শুরম্ন করে মৃত্যুর আগ পর্যমত্ম দেশে বিদেশে ২২ টিরও বেশি একক ও যৌথ প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছে তার ছবি। রক্ষিত হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর ও দেশের সংসদ সচিবলায়সহ প্রায় সমসত্ম আর্ট গ্যালারিতে। এছাড়া অসংখ্য ছবি রয়ে গেছে দেশ ও বিদেশের চিত্র-সমঝদারদের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা সমূহে। তার ছবির বিশিষ্ট সংগ্রাহকদের মধ্যে রয়েছেন ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, নেপালের রাজা, ফিলিন্থিনির প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত, যুগোসস্নাভিয়ার বিশ্ব নেতা মার্শাল টিটো, সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটন, সাবেক মার্কিন ফার্ষ্ট লেডি ও বর্তমান পররাষ্টমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন সহ শিল্পির অাঁকা ২টি ছবি হোয়াইট হাউজেও স্থান পেয়েছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও কুটনৈতিক ও শিল্পানুরাগী ব্যক্তিবর্গের সংগ্রাহশালায় মধ্যে রয়েছেন শিল্পির আকাঁ ছবি। প্রয়াত মাননীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ সাহেবের জ্ঞাতার্থে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে এই শিল্পকর্মগুলো বাহিরে সফরের সময় উপহার স্বরূপ দেওয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় এবং বর্তমানেও এই ধারা বিদ্যমান।

 

শিল্পীর জীবনে সবচেয়ে স্বরনীয় ঘটনা হল, স্বাধীনতার পর ভারতের প্রয়াত তৎকালীণ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গার্ন্ধী বাংলাদেশে সফরে এলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিল্পীর হাতে অাঁকা একটি ছবি উপহার দেন যা বর্তমানে নয়াদিলিস্নর মর্ডান আর্ট গ্যালারিতে শোভা পাচ্ছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই শিল্পীকে আদর করে নৌকা আনোয়ার বলে ডাকতেন। তার নির্দেশেই তিনি সরাজীবন নৌকার ছবি একে গেছেন।

 

মাদারীপুর শহরে শিল্পীর ছেলেবেলাতে আড়িয়াল খাঁ নদী কেন্দ্রিক মাঝিমালস্না ও খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের সঙ্গে যে পরিচয় ঘটেছে তা তার পরিনত বয়সে সম্প্রসারণ ও চিত্রাল রূপায়ন। স্ত্রী, দুই পুত্র, দুই কন্যা রেখে মাদারীপুর শহরে রংতুলি হাতেই হৃদরোগে আক্রামত্ম হয়ে পরাপারে তরী ভিড়িয়েছেন আধ্যাত্মিক চিমত্মায় বিশ্বাসী এই শিল্পী। ৮ ফেব্রম্নয়ারী ২০০৭ সালে কালের স্রোতে ভাসিয়ে দিয়ে গেছেন তার অজস্ত্র, বিচিত্র বহুবর্ণিল নৌকার সারি।

 

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান ও মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য স্বেচ্ছাসেবকলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বাহাউদ্দিন নাসিম এর প্রচেষ্টায় মাদারীপুর জেলা প্রশাষক ও ইউএনও, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এর সহযোগীতায় চিত্রশিল্পি কাজী আনোয়ার হোসেনের স্বরনে মাদারীপুর জেলা রাসিত্ম ইউনিয়ন কাঠপট্টিসহ মনষা কান্দি রাসত্মাটি শিল্পির নামে নামকরণ করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। উক্ত রাসত্মাটির নামকরণের জন্য শিল্পির পরিবারের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান, সংসদ সদস্য মাদারীপুর-৩ বাহাউদ্দিন নাসিম, উপজেলা চেয়ারম্যান শফিক খান ও থানা নির্বাহী অফিসার মাদারীপুর সদরসহ সংশিস্নষ্ট সবাইর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

 

মৃত্যুকালে তিনি ২,০০০ এর বেশি শিল্পকর্ম রেখে গেছেন যার মধ্যে বেশিরভাগই নৌকার ছবি। শিল্পীর জীবনে শেষ ইচছা পূরনের লক্ষে শিল্পীর জীবনের সর্বশেষ মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে জীবন ও জগৎ নিয়ে যে শিল্পকর্ম তৈরী করেছিল তার সবগুলো একত্রিত করে সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে একটি প্রদর্শনির আয়োজন করা এবং সেই প্রদর্শিনীতে বাংলাদেশে সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান অতিথি হিসেবে পেতে চান তার পরিবার, তাহলে শিল্পির সারা জীবনের সকল কামনা বাসনা পরিপূর্নতা পাবে এবং শিল্পির পরিবার ও তার মাদারীপুরের এলাকাবাসী এক মহান গর্বের অধিকারী হবে।